মোবাইলের আসল ব্যাটারি চেনার উপায় কী?

মোবাইলের আসল ব্যাটারি চেনার উপায় কী?

আপনার ফোনটা হঠাৎ করে আগের মতো চার্জ ধরে রাখছে না। ১০০% থেকে ৩০% নেমে যাচ্ছে খুব দ্রুত। দোকানে গেলেন, দোকানদার বললো, অরিজিনাল ব্যাটারি আছে, কম দামে দিয়ে দিচ্ছি। আপনি নিশ্চিন্ত মনে ব্যাটারী রিপ্লেস করে  ব্যবহার শুরু করলেন। কিন্তু কয়েকদিন পর দেখলেন ফোন গরম হওয়াসহ নানাবিধ সমস্যা হচ্ছে। তখনই মনে প্রশ্ন আসে—আমি কি নকল ব্যাটারি কিনলাম?

আজকাল অনলাইনে বা লোকাল দোকানে খুব সহজেই Original লেখা ব্যাটারি পাওয়া যায়। কিন্তু সত্যি কথা হলো, সব Original আসলে অরিজিনাল নয়। অনেক সময় হাই-কপি, রিফারবিশড (পুরনো ব্যাটারি নতুন করে মোড়ানো) বা নিম্নমানের অ্যাসেম্বলড  ব্যাটারি নতুন বলে বিক্রি হয়।

এইসব কারণে এবং ঝুঁকি এড়াতে মোবাইলের আসল ব্যাটারি চেনার উপায় জানা খুবই জরুরি—কারণ নকল ব্যাটারি শুধু ফোনের ক্ষতি করে না, আপনার নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

Table of Contents

  1. মোবাইলের আসল ব্যাটারি চেনার উপায় কী?
  2. ব্যাটারি কেনার আগে কী করবেন?
  3. আসল ব্যাটারি কতদিন ভালো থাকে?
  4. বাজারে নকল ব্যাটারির ৩টি ধরন
  5. নকল ব্যাটারি ব্যবহার করলে কী ক্ষতি হতে পারে?
  6. Original Battery vs High-Copy Battery – পার্থক্য কী?
  7. উপসংহার

 

মোবাইলের আসল ব্যাটারি চেনার উপায় কী?

মোবাইলের আসল ব্যাটারি চেনার উপায় কী? এই প্রশ্নের উত্তর জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নকল ব্যাটারি আপনার ফোন ও নিরাপত্তা দুটোকেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। নিচে এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

১. ব্যাটারির গায়ের লেখা ভালো করে দেখুন

ব্যাটারির গায়ের লেখা পরীক্ষা করা হলো মোবাইলের আসল নাকি নকল চেনার সবচেয়ে সহজ উপায়। আসল ব্যাটারিতে সাধারণত স্পষ্ট সিরিয়াল নম্বর, পরিষ্কার QR কোড এবং প্রিন্ট থাকে। এছাড়াও লেখা হালকা নীলচে সাদা রঙের হয়।অন্যদিকে, নকল ব্যাটারিতে লেখা ঘষলেই উঠে যেতে পারে, প্রিন্ট ঝাপসা বা অস্পষ্ট দেখা যায়। অনেক সময় বানান ভুল থাকে এবং লোগোও বিকৃত বা ভুল দেখা যায়।

যদি ব্যাটারির লেখা স্টিকার আকারে লাগানো থাকে বা খুব সহজেই উঠে যায়, তাহলে সেটি নকল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। 

২. উৎপাদনের তারিখ মিলিয়ে দেখুন

প্রতিটি ব্যাটারির ওপর তার উৎপাদনের বছর লেখা থাকে। এটি দেখে আপনি ধারণা করতে  পারেন ব্যাটারিটি আসল কি না। ধরুন, আপনার ফোনটি ২০২০ সালে বাজারে এসেছে। কিন্তু আপনি যে ব্যাটারি কিনছেন, তার উৎপাদনের তারিখ ২০২৪। এ ক্ষেত্রে খুব সম্ভব যে ব্যাটারিটি আসল নয়। সাধারণত ফোন বাজারে আসার এক বছরের মধ্যে সেই ফোনের ব্যাটারি তৈরি হয়। তাই ব্যাটারির উৎপাদনের তারিখ দেখে সবসময় যাচাই করা উচিত।

৩. ওজন পরীক্ষা করুন

ওজন পরীক্ষা করা আসল ব্যাটারি চেনার খুবই কার্যকর একটি পদ্ধতি।

আসল লিথিয়াম ব্যাটারির একটি নির্দিষ্ট ওজন থাকে। কিন্তু নকল ব্যাটারির ভেতরে অনেক সময় ছোট সেল বসিয়ে শুধু খালি জায়গা ভরে রাখা হয়। এর ফলে ব্যাটারি তুলনামূলকভাবে অনেক হালকা হয়।

যদি সম্ভব হয়, আপনি একটি সাধারণ কিচেন স্কেলে ব্যাটারির ওজন মাপুন। অরিজিনাল ব্যাটারির তুলনায় অনেক হালকা হলে সেটি নকল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, তাই সতর্ক থাকা উচিত।

৪. ব্যাটারির গঠন (Build Quality) পরীক্ষা করুন

ব্যাটারি হাতে নিয়ে ভালো করে দেখুন। আসল ব্যাটারি হলে সিলিং বা মোড়ক মসৃণ থাকে, কানেক্টর অংশ সমান এবং ফ্লেক্স কেবল শক্ত ও টেকসই হয়। ব্যাটারিতে সামান্য চাপ দিলে নরম ভাব অনুভূত হয়, যা আসল ব্যাটারির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

অপরদিকে, হাই-কপি বা নকল ব্যাটারিতে আঠা বের হয়ে থাকতে পারে, কানেক্টর বাঁকা বা অসমান এবং সস্তা প্লাস্টিক ব্যবহৃত হয়। চাপ দিলে খুব শক্ত লাগে এবং এটি ফোনের সাথে ঠিকভাবে মানায় না। বিশেষ করে আইফোন-এর ব্যাটারির ক্ষেত্রে আসলগুলো সামান্য নরম লাগে, আর হাই-কপিগুলো সাধারণত শক্ত হয়। ।

৫. পাওয়ার (mAh) অস্বাভাবিক হলে সন্দেহ করুন

প্রতিটি মোবাইলের ব্যাটারির একটি নির্দিষ্ট সর্বোচ্চ ক্ষমতা থাকে। অর্থাৎ, ফোনের আসল ব্যাটারি কত mAh চার্জ ধরে রাখতে পারে, সেটা কোম্পানি নির্ধারণ করে।

ধরে নিন, দোকানদার বললো, “এই ব্যাটারি 8000mAh!”

কিন্তু আপনার ফোনের আসল ব্যাটারির  ক্ষমতা হলো 3000mAh। এক্ষেত্রে বুঝতে হবে, দোকানদার বাড়িয়ে বলেছে। বাজারে অনেক নকল বা হাই-কপি ব্যাটারিতে এমন অতিরঞ্জিত ক্ষমতা লেখা থাকে। তাই ব্যাটারির পাওয়ার আসল মডেলের সঙ্গে মিলছে কিনা তা নিশ্চিত করা জরুরি।

৬. চার্জিং ও ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করুন

ব্যাটারি লাগানোর পর কয়েক দিন খেয়াল করুন। প্রথমে লক্ষ্য করুন, চার্জ হতে কত সময় লাগছে। যদি চার্জ খুব ধীরে হয় বা ফোন ব্যবহার করার সময় অস্বাভাবিকভাবে গরম হয়ে যায়, তাহলে সতর্ক হওয়া দরকার। এছাড়া চার্জ খুব দ্রুত এবং অস্বাভাবিকভাবে  শেষ হচ্ছে কিনা সেটাও দেখুন। এমন সব সমস্যা দেখা দিলে বুঝবেন যে ব্যাটারি ভালো নয় এবং সেটি ব্যবহার না করাই নিরাপদ।

৭. প্যাকেট ও ব্র্যান্ড যাচাই করুন

যখন আপনি ব্যাটারি কিনবেন, প্যাকেট ও ব্র্যান্ড ভালোভাবে দেখাটা খুব জরুরি। আসল কোম্পানি সাধারণত সুন্দর ও ভালো কোয়ালিটির প্রিন্ট করা বক্স দিয়ে থাকে। সঙ্গে থাকে ওয়ারেন্টি কার্ড, যাতে কোনো সমস্যা হলে ফেরত বা সার্ভিস নিতে পারেন। এছাড়া রিটার্ন পলিসিও থাকে, যা ব্যবহারকারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

অপরদিকে নকল ব্যাটারি প্রায়ই পাতলা এবং সস্তা প্যাকেটে আসে। ব্র্যান্ডের লোগো ঝাপসা বা অস্পষ্ট থাকে, আর সাধারণত কোনো ওয়ারেন্টি বা রিটার্ন পলিসি থাকে না। তাই প্যাকেট ও ব্র্যান্ড দেখেই অনেকটা বুঝে নেওয়া যায় ব্যাটারি আসল নাকি নকল।

৮. খুব কম দামে কিনবেন না

অনেক সময় দোকান বা অনলাইনে কেউ খুব সস্তা দামে ব্যাটারি “অরিজিনাল” বলে বিক্রি করে। ধরুন, আসল ব্যাটারির দাম ২০০০ টাকা। আর কেউ ৬০০ টাকায় দেয়।এমন হলে বুঝবেন, এটি প্রায় নিশ্চিতভাবে নকল। ভালো মানের ব্যাটারি কখনো খুব কম দামে পাওয়া যায় না। তাই শুধুমাত্র সস্তার জন্য না দেখে কোন ব্যাটারি কিনবেন না। 

৯. সার্ভিস সেন্টার থেকে কিনুন

সবচেয়ে নিরাপদ উপায় হলো অফিসিয়াল সার্ভিস সেন্টার বা পরিচিত দোকান থেকে ব্যাটারি কেনা। সেখানে বিক্রি হওয়া ব্যাটারিগুলো বেশিরভাগ সময়েই  আসল এবং গ্যারান্টিযুক্ত হয়। অপরদিকে, অনলাইনে অজানা বিক্রেতার কাছ থেকে ব্যাটারি কেনা ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক সময় সেখানে নকল বা হাই-কপি ব্যাটারি পাঠানো হয়।

ব্যাটারি কেনার আগে কী করবেন?

ব্যাটারি কেনার আগে কিছু বিষয় খেয়াল রাখা খুবই জরুরি। প্রথমে, নিজের ফোনের মডেল ঠিকভাবে জেনে নিন। তার পরে, আগের ব্যাটারির তথ্যের সঙ্গে নতুন ব্যাটারির তথ্য মিলিয়ে দেখুন। এরপর দোকানদারের কাছ থেকে ব্যাটারির ওয়ারেন্টি জিজ্ঞেস করুন, যাতে কোনো সমস্যা হলে রিপেয়ার বা বদল করা যায়। সবশেষে, অবশ্যই কেনার সময় একটি রসিদ বা বিল সংগ্রহ করুন, যাতে ভবিষ্যতে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

আসল ব্যাটারি কতদিন ভালো থাকে?

আসল ব্যাটারি সাধারণত ১.৫ থেকে ২ বছর ভালো থাকে। এই সময়ের মধ্যে এটি পুরোপুরি কাজ করতে পারে এবং ফোনকে ঠিক মতো চার্জ দেয়। এছাড়াও, আসল ব্যাটারি প্রায় ৫০০ থেকে ৮০০ চার্জ সাইকেল সহ্য করতে পারে। অন্যদিকে, নকল বা হাই-কপি ব্যাটারি খুব দ্রুত দুর্বল হয়ে যায়। অনেক সময় মাত্র ৩–৬ মাসের মধ্যে এর ক্ষমতা কমতে শুরু করে এবং ফোন ঠিকমতো কাজ করতে থাকে না।

বাজারে নকল ব্যাটারির ৩টি ধরন

বাজারে সাধারণত তিন ধরনের নকল ব্যাটারি দেখা যায়।

  • রিফারবিশড পুরনো ব্যাটারি: এই ধরনের ব্যাটারি আগের ব্যবহার করা ব্যাটারি খুলে নতুন মোড়ক লাগিয়ে নতুন বলে বিক্রি করা হয়। দেখতে নতুন মনে হলেও ভেতরে পুরনো সেল থাকে, তাই এর ক্ষমতা ও স্থায়িত্ব অনেক কম।
  • হাই-কপি অ্যাসেম্বল ব্যাটারি: এই ব্যাটারিতে আসল সেলের বদলে চীনা সেল ব্যবহার করা হয়। সঙ্গে নকল লোগো ও সস্তা সার্কিট থাকে। দেখতেও আসল মতো লাগে, কিন্তু ব্যবহার করলে সমস্যা দেখা দিতে পারে, যেমন দ্রুত চার্জ শেষ হওয়া বা অতিরিক্ত গরম হওয়া।
  • অরিজিনাল + স্টিকার ব্র্যান্ড: এই ব্যাটারির ভিতরে আসল সেল থাকে, কিন্তু উপরে আলাদা ব্র্যান্ডের স্টিকার লাগিয়ে বিক্রি করা হয়। দাম একটু বেশি হলেও সব সময় এটি পুরোপুরি নিরাপদ নয়, কারণ কিছু বিক্রেতা শুধু স্টিকার পরিবর্তন করেই বিক্রি করে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো—সব উচ্চ দামের ব্যাটারি আসল নয়, তাই কেনার আগে ভালোভাবে যাচাই করা জরুরি।

নকল ব্যাটারি ব্যবহার করলে কী ক্ষতি হতে পারে?

নকল ব্যাটারি ব্যবহার করলে অনেক ধরনের সমস্যা হতে পারে। ফোনের মাদারবোর্ড ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যার ফলে ফোন ঠিকমত কাজ করবে না।কখনো কখনো স্ক্রিন ব্ল্যাক হয়ে যেতে পারে এবং পুরো ফোন অচল হয়ে যায়।

অনেক সময় নকল ব্যাটারি ফুলে যায়, যা ডিসপ্লেকে উপরের দিকে ঠেলে দিতে পারে।এছাড়াও চার্জিং আইসি নষ্ট হয়ে ফোন চার্জ নিতে পারবে না।সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হলো, নকল ব্যাটারি অতিরিক্ত গরম হয়ে আগুন লাগার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।তাই কখনোই নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলবেন না।

Original Battery vs High-Copy Battery – পার্থক্য কী?

মোবাইলের ব্যাটারি কেনার সময় এটি বোঝা খুব গুরুত্বপূর্ণ যে, আপনি আসল ব্যাটারি কিনছেন নাকি হাই-কপি। বাইরের দিকে দেখতে অনেকটা একরকম হলেও ভেতরের মান, নিরাপত্তা এবং কর্মক্ষমতা অনেক আলাদা। 

 

বিষয় Original Battery (আসল ব্যাটারি) High-Copy Battery (নকল/হাই-কপি)
ক্ষমতা (mAh) আসল, সঠিক ও পরীক্ষিত প্রায়ই বাড়িয়ে লেখা হয়, প্রকৃত ক্ষমতা কম
সেফটি সার্কিট থাকে, ফোনকে ওভারলোড এবং শর্ট সার্কিট থেকে রক্ষা করে অনেক সময় থাকে না, তাই ঝুঁকিপূর্ণ
ওজন নির্দিষ্ট ও ভারী হালকা হতে পারে, কারণ ভেতরের সেল ছোট বা নিম্নমানের
স্থায়িত্ব ১–২ বছর ভালো চলে, চার্জ সাইকেল দীর্ঘ ৩–৬ মাসে সমস্যা দেখা দিতে পারে, দ্রুত নষ্ট হয়
চার্জিং পারফরম্যান্স স্থির ও নিরাপদ, চার্জিং নির্ভরযোগ্য গরম হয়, চার্জ ধীর বা অনিয়মিত

 

হাই-কপি ব্যাটারি দেখতে প্রায় একই রকম হলেও ভেতরের সেল নিম্নমানের হয়,তাই ফোন গরম হয়, চার্জ ধরে রাখে না এবং নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করে।

উপসংহার

মোবাইলের আসল ব্যাটারি চেনার জন্য শুধু সচেতনতা যথেষ্ট, খুব সস্তা বা সুন্দর প্যাকেট দেখে বিভ্রান্ত হবেন না।বিশ্বস্ত দোকান থেকে ব্যাটারি কিনলেই গুণমান, সঠিক মডেল এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকে। আপনি চাইলে সঠিক ও জেনুইন ব্যাটারি সহজেই কিনতে পারেন Apple Gadgets Care থেকে। এখানে পাবেন অফিসিয়াল ওয়ারেন্টি, ভেরিফাইড ইনফরমেশন এবং ট্রাস্টেড আফটার-সেলস সাপোর্ট।

Chat with us