iOS Update দিলে কি ফোন স্লো হয়?

iOS Update দিলে কি ফোন স্লো হয়

“ভাই, iOS আপডেট দিলে কি ফোন স্লো হয়ে যায়?” – এই প্রশ্ন প্রায় প্রতিটি iPhone ইউজার অন্তত একবার হলেও করেছেন। বিশেষ করে যখন আপনার ৩-৪ বছরের পুরনো iPhone 11 বা iPhone 12-তে নতুন আপডেট আসে, তখন মনের মধ্যে একটা ভয় কাজ করে, “আপডেট দিলে কি আমার দামি ফোনটা স্লো হয়ে যাবে?” 

এই দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থেকেই জন্ম নেয় অসংখ্য Google সার্চ, YouTube ভিডিও দেখা এবং বন্ধুদের কাছে পরামর্শ চাওয়া। কেউ বলে, “আপডেট দিস না ভাই, আমার ফোন একদম স্লো হয়ে গেছে।” আবার কেউ বলে, “আপডেট না দিলে সিকিউরিটি প্রবলেম হবে।” এত কনফিউশনের মধ্যে সত্য ঘটনা আসলে কোনটি? iOS Update দিলে কি ফোন স্লো হয়? আজকের এই আর্টিকেলের মাধ্যমে জানতে পারবেন  iOS আপডেট আসলেই ফোন স্লো করে কিনা এবং কীভাবে এই সমস্যা সমাধান করা যায়। 

iOS Update নিয়ে ব্যবহারকারীদের কেন এই অভিযোগ ?

Apple Support Community তে একটু ঘোরাঘুরি করলেই দেখবেন হাজারো ব্যবহারকারী নতুন iOS আপডেটের পর ফোনের পারফরম্যান্স সমস্যার কথা জানিয়েছেনবিশেষ করে তারা উল্লেখ করেছেন

  • তাদের ফোনে ল্যাগ খায়।
  • অ্যাপ লোড হতে দেরি হয়।
  • ব্যাটারি খুব দ্রুত শেষ হয়ে যায়।
  • স্ক্রলিং বা অ্যানিমেশনে ধীরতা দেখা দেয়। 

ধরনের অভিযোগ শুধু একটি নির্দিষ্ট মডেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং পুরোনো iPhone মডেলগুলোর ক্ষেত্রে সমস্যা তুলনামূলকভাবে বেশি চোখে পড়েবাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নতুন iOS আপডেট সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য কিছুটা বিভ্রান্তিকর হয়ে উঠতে পারেকারণ নতুন ফিচারের সঙ্গে সঙ্গে সিস্টেমের চাপও বাড়ে।  

iOS Update কি ইচ্ছাকৃতভাবে ফোন স্লো করে?

সংক্ষেপে উত্তর হচ্ছে- না, Apple ইচ্ছাকৃতভাবে iPhone ধীর করার জন্য iOS আপডেট দেয় না। iOS আপডেটের মূল উদ্দেশ্য হলো নিরাপত্তা জোরদার করা, নতুন ফিচার যোগ করা এবং ব্যবহারকারীর ডেটা সুরক্ষা নিশ্চিত করা। তবে ব্যাকগ্রাউন্ড প্রসেস ও নতুন ফিচারের চাপেরকারণে সাময়িকভাবে ফোন স্লো মনে হতে পারে, যা সাধারণত স্থায়ী হয়না। 

iOS Update দিলে ফোন স্লো হওয়ার প্রধান কারণসমূহ 

iOS Update দেওয়ার পর ফোন ধীর মনে হওয়ার প্রধান কিছু কারণ নিম্নে আলোচনা করা হল-  

১. ব্যাকগ্রাউন্ড প্রসেসিং 

নতুন iOS ইনস্টল করার পর iPhone ব্যাকগ্রাউন্ডে একসাথে অনেক কাজ শুরু করে, যেমন—

  • ছবি ও ফাইল পুনরায় ইনডেক্স করা।
  • সার্চ ডেটা আপডেট করা।
  • অ্যাপ ডেটা অপটিমাইজ করা। 

এই কাজগুলো ব্যবহারকারীর চোখে ধরা পড়ে না, কিন্তু প্রসেসর ও ব্যাটারির ওপর বাড়তি চাপ ফেলে। তাই আপডেটের পর প্রথম ১–৩ দিন ফোন কিছুটা ধীর লাগা স্বাভাবিক। 

২. নতুন ফিচার ও গ্রাফিক্যাল ইফেক্ট

প্রতিটি নতুন iOS ভার্সনে Apple নতুন ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট, অ্যানিমেশন ও স্মার্ট ফিচার যোগ করে। নতুন মডেলের iPhone-এর জন্য এগুলো ভালোভাবে অপ্টিমাইজড হলেও পুরোনো ডিভাইসে RAM-এর ব্যবহার বেড়ে যায় পাশাপাশি GPU-এর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে ফলে স্ক্রলিং, অ্যাপ ওপেন করা বা মাল্টিটাস্কিং আগের মতো স্মুথ নাও লাগতে পারে।

৩. অ্যাপ কম্প্যাটিবিলিটি সমস্যা

সব অ্যাপ ডেভেলপার একসঙ্গে নতুন iOS-এর জন্য অ্যাপ আপডেট করতে পারে না। তাই কিছু পুরোনো অ্যাপ নতুন iOS-এ ঠিকভাবে কাজ করে না এবং কিছু অ্যাপ ব্যাকগ্রাউন্ডে অপ্রয়োজনীয় রিসোর্স ব্যবহার করে, এর প্রভাব পড়ে পুরো সিস্টেমের ওপর; এবং ফোন স্লো মনে হয়।

৪. স্টোরেজ কম থাকা

অনেক ব্যবহারকারীর iPhone-এ স্টোরেজ প্রায় পূর্ণ থাকে। আপডেটের পর সিস্টেমের অস্থায়ী ফাইল তৈরি হয় এবং cache data বাড়ে তাই স্টোরেজ খুব কম থাকলে iOS স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে না এবং ফোন ধীর হয়ে যায়।

৫. ব্যাটারি হেলথ ও পারফরম্যান্স ম্যানেজমেন্ট

এক সময় Apple ব্যাটারি ডিগ্রেড হলে পারফরম্যান্স কমিয়ে দিত যাতে হঠাৎ ফোন বন্ধ হয়ে না যায়। এখন ব্যবহারকারীরা ব্যাটারি হেলথ দেখতে পারেন, কিন্তু বাস্তবতা হলো ব্যাটারির ক্যাপাসিটি কম হলে সিস্টেম নিজে থেকেই পারফরম্যান্স সীমিত করতে পারে এটি ডিভাইস সুরক্ষার জন্য হলেও ব্যবহারকারীর কাছে ফোন ধীর মনেে হয়।

তাহলে এসকল সমস্যার সমাধান কী? 

১. কিছুদিন অপেক্ষা করুন

আপডেটের পর iPhone ব্যাকগ্রাউন্ডে অনেক কাজ করে ফটো ইনডেক্সিং, অ্যাপ অপটিমাইজেশন ইত্যাদি। এই সময় ফোন একটু ধীর লাগা স্বাভাবিক। আপনি নতুন iOS আপডেট দেওয়ার পর দেখলেন ক্যামেরা খুলতে সময় নিচ্ছে বা কিবোর্ড দেরিতে আসছে। সাধারণত ১–৩ দিনের মধ্যেই এসব স্বাভাবিক হয়ে যায়।

২. ফোন রিস্টার্ট করুন

রিস্টার্ট করলে RAM পরিষ্কার হয়, অস্থায়ী গ্লিচ দূর হয়। হঠাৎ WhatsApp খুলতে দেরি হচ্ছে বা Control Center আটকে যাচ্ছে, একবার Restart দিলেই অনেক সময় সমস্যা চলে যায়

৩. অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ ও উইজেট সরান

অ্যাপ যত বেশি, ব্যাকগ্রাউন্ড লোড তত বেশি। অপ্রয়োজনীয় এবং পুরোনো অ্যাপ ডিলিট করলে ফোন হালকা হয় এবং গতি বাড়ে। তাই এই বিষয়টি খেয়াল করুন।  

৪. Background App Refresh সীমিত করুন

প্রথমে ফোনের Settings অ্যাপে ঢুকুন। সেখানে General অপশনটি খুঁজে নিন। General-এর ভেতরে গেলে আপনি Background App Refresh নামে একটি অপশন পাবেন। এখানে ঢুকলে কোন কোন অ্যাপ ব্যাকগ্রাউন্ডে ইন্টারনেট ও সিস্টেম রিসোর্স ব্যবহার করছে, তা দেখা যাবে। এখান থেকে আপনি চাইলে পুরো ফিচার বন্ধ করতে পারেন, অথবা শুধু প্রয়োজনীয় অ্যাপ চালু রেখে বাকি ভারী অ্যাপগুলো বন্ধ করে দিতে পারেন। এতে ফোনের RAM ও ব্যাটারির ওপর চাপ কমে এবং ফোন স্মুথ মনে হয়।

৫. Reduce Motion চালু করুন

ফোনের Settings অ্যাপে গিয়ে Accessibility অপশনে ঢুকুন। সেখানে Motion নামে একটি মেনু পাবেন। Motion-এর ভেতরে ঢুকলে Reduce Motion নামে একটি টগল সুইচ থাকবে। এটি চালু করলে স্ক্রিনের অ্যানিমেশন ও ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট কমে যাবে। ফলে অ্যাপ খোলার সময় বা স্ক্রিন বদলানোর সময় অতিরিক্ত গ্রাফিক্স লোড পড়বে না, বিশেষ করে পুরোনো iPhone-এ ফোন অনেক বেশি দ্রুত মনে হবে।

৬. ব্যাটারি হেলথ পরীক্ষা করুন

Settings অ্যাপ খুলে Battery সেকশনে যান। সেখানে ঢুকলে Battery Health অপশনটি দেখতে পাবেন। এখানে গিয়ে আপনি ফোনের বর্তমান ব্যাটারি ক্যাপাসিটি বা Maximum Capacity দেখতে পারবেন। যদি এই মান ৮০ শতাংশের নিচে নেমে যায়, তাহলে iOS নিরাপত্তার জন্য পারফরম্যান্স কিছুটা সীমিত করে দেয়। তাই এখানে মান কম দেখালে ব্যাটারি পরিবর্তন করে নিন। 

৭. সব অ্যাপ আপডেট করুন

App Store খুলে উপরের ডান পাশে থাকা আপনার প্রোফাইল আইকনে ট্যাপ করুন। সেখানে ঢুকলে যেসব অ্যাপ আপডেট বাকি আছে, সেগুলোর তালিকা দেখাবে। চাইলে একসাথে সব অ্যাপ আপডেট করতে পারেন। এতে পুরোনো অ্যাপেরকারণে হওয়া ল্যাগ বা ক্র্যাশের সমস্যা অনেক সময় ঠিক হয়ে যায়।

৮. Reset All Settings (শেষ উপায়)

প্রথমে Settings অ্যাপে যান, তারপর General অপশনে প্রবেশ করুন। সেখানে নিচের দিকে গেলে Transfer or Reset iPhone অপশন পাবেন। এতে ঢুকে Reset নির্বাচন করুন এবং এরপর Reset All Settings চাপুন। এতে আপনার ছবি, ভিডিও বা অ্যাপ ডিলিট হবে না, শুধু Wi-Fi, Bluetooth, নেটওয়ার্ক, সাউন্ড ও ডিসপ্লে সংক্রান্ত সেটিংগুলো নতুন করে সেট হবে। আপডেটের পর যদি সমস্যা দেখা দেয়, যেমন Wi-Fi ঠিকমতো কাজ না করা বা নোটিফিকেশন দেরিতে আসা, তাহলে এই রিসেট অনেক সময় কার্যকর সমাধান দেয়।

এই ধাপগুলো অনুসরণ করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই iOS Update-এর পর হওয়া স্লো পারফরম্যান্স স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।

তাহলে iOS Update দেওয়া কি উচিত?

iOS Update দেওয়া অত্যাবশ্যকীয়,কারণ এতে ফোনের নিরাপত্তা ঝুঁকি কমে এবং বিভিন্ন সাইবার হুমকি থেকে ডিভাইস সুরক্ষিত থাকে। একই সঙ্গে ব্যবহারকারীরা নতুন ফিচার এক্সপ্লোর করতে পারেন ও উন্নত সুবিধা পান, যা ফোন ব্যবহারের অভিজ্ঞতাকে আরও স্মুথ করে তোলে। তাছাড়া, অধিকাংশ অ্যাপ নতুন iOS ভার্সনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে আপডেট হয়। নিয়মিত আপডেট না করলে অনেক অ্যাপ ঠিকভাবে কাজ নাও করতে পারে বা সাপোর্ট বন্ধ হয়ে যেতে পারে। 

তবে আপডেটের আগে কিছু প্রস্তুতি জরুরি, যেমন – 

  • স্টোরেজে অন্তত ১০–১৫% জায়গা ফাঁকা রাখা, 
  • iCloud বা কম্পিউটারে ব্যাকআপ নেওয়া, 
  • ব্যাটারি ৫০% বা তার বেশি রাখা এবং 
  • প্রয়োজনীয় অ্যাপ আপডেট করা। 

এসব মানলে আপডেটের পর ফোন স্লো হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। 

পরিশেষ 

iOS 26-এর মতো বড় কোনো আপডেটের পর ফোন কিছুটা ধীর লাগা খুবই সাধারণ বিষয় এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি সাময়িক। কারণ iOS আপডেটের পর সিস্টেম ব্যাকগ্রাউন্ডে নানা অপটিমাইজেশন ও সেটআপ কাজ শেষ করে। এসব কাজ শেষ হলে সাধারণত ফোনের পারফরম্যান্স স্বাভাবিক হয়ে আসে। তবে যদি কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ পার হয়ে যাওয়ার পরও ফোনের গতি ঠিক না হয়, তাহলে উপরে উল্লেখ করা সমাধানগুলো প্রয়োগ করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সমস্যা অনেকটাই কমে যায়। আর যদি এসব সাধারণ সমাধান কাজ না করে, তাহলে নিকটস্থ কোনো অনুমোদিত সার্ভিস সেন্টারে গিয়ে দেখানো ভালো।কারণ তখন সমস্যাটি সফটওয়্যার নয়, হার্ডওয়্যার-সংক্রান্তও হতে পারে।

Chat with us