ফোনে চার্জ না হওয়ার সমস্যা হলে করণীয়

ফোনে চার্জ না হলে করণীয়

স্মার্টফোন এখন আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী, শুধু কথা বলার মাধ্যম নয়, বরং কাজ, পড়াশোনা, যোগাযোগ, বিনোদন থেকে শুরু করে অনলাইন ব্যাংকিংসহ দৈনন্দিন প্রায় সবকিছুরই কেন্দ্রবিন্দু। তাই হঠাৎ করে ফোন চার্জ না নেওয়া বা খুব ধীরে চার্জ হওয়া শুরু করলে বিরক্তি তো বাড়েই, সঙ্গে থমকে যায় জরুরি কাজও।

তবে এই সমস্যাগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই খুব জটিল নয় এবং একটু চেষ্টা করলে ঘরে বসেই সমাধান করা সম্ভব। সাধারণত চার্জার বা ক্যাবলের সমস্যা, চার্জিং পোর্টে জমে থাকা ধুলো-ময়লা, সফটওয়্যারের গোলযোগ, ব্যাকগ্রাউন্ডে চলা অ্যাপ, ব্যাটারির বয়স বা কোনো হার্ডওয়্যার সমস্যার কারণে এমনটা হয়ে থাকে।

ফোনের চার্জিং সমস্যার কারণ ও করণীয়

বিভিন্ন কারণে আপনার ফোনের চার্জিং-এ সমস্যা হতে পারে, এই কারণগুলোর বেশিরভাগের সাথেই আমরা সবাই পরিচিত হয়তবা উপায় বুঝিনা বলে নিজে থেকে সমাধান করা সম্ভব হয় না।  চলুন দেখে নেয়া যাক এইসব কারণ এবং এদের সম্ভাব্য সমাধানগুলো-

 

১. ব্যবহৃত চার্জার বা ক্যাবল এর সমস্যা 

চার্জিং সমস্যার সবচেয়ে কমন কিন্তু যে বিষয়টি আমরা স্কিপ করে যাই সেটি হচ্ছে চার্জার আর ক্যাবলের সমস্যা। 

আমরা সাধারণত ক্যাবলটাকে উল্টাপাল্টাভাবে ভাঁজ করে রাখি কিংবা সঠিক উপায়ে ব্যবহার করিনা। ফলে ভেতরের তার ধীরে ধীরে ছিঁড়ে যায়, যদিও বাইরে থেকে ঠিকই দেখায়। তখন চার্জ ঠিকমতো ট্রান্সফার হয় না। 

আরেকটা বড় ভুল হলো আনঅথরাইজড চার্জার ব্যবহার করা। সব চার্জার এক রকম নয়, ভোল্টেজ আর পাওয়ার আউটপুট মিল না থাকলে ফোন ঠিকভাবে চার্জ নিতে পারে না, এমনকি দীর্ঘমেয়াদে ব্যাটারির ক্ষতিও হতে পারে। এক্ষেত্রে আপনার করণীয় হচ্ছে- 

  • অন্য একটি ভালো ক্যাবল দিয়ে টেস্ট করুন।
  • অরিজিনাল বা ব্র্যান্ডেড চার্জার ব্যবহার করুন। 

২. চার্জিং পোর্টের সমস্যা

ফোনের চার্জিং পোর্ট খুবই সেনসিটিভ। এখানে সামান্য ধুলো, লিন্ট, বা আর্দ্রতা থাকলেও চার্জিং বন্ধ হয়ে যেতে পারে। অনেক সময় কাপড়ের ছোট ফাইবার বা ময়লা জমে পিনের সংযোগ ব্লক হয়ে যায়। আবার পানি ঢুকলে অক্সিডেশন হয়ে পোর্ট নষ্ট হয়ে যেতে পারে। আর যদি পোর্টে আঘাত লাগে বা বেঁকে যায়, তাহলে ক্যাবল ঢুকলেও সঠিকভাবে কানেকশন পায়না। এক্ষেত্রে করণীয় হচ্ছে-

৩. সফটওয়্যারজনিত সমস্যা

অনেকেই ভাবেন চার্জিংয়ে ইস্যু মানেই হার্ডওয়্যারে সমস্যা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে সফটওয়্যার ইস্যুও বড় ভূমিকা রাখে। কখনও আপডেটের পর সিস্টেমে গ্লিচ তৈরি হয়, যার ফলে ফোন চার্জিং স্লো করে দেয় বা ওয়ার্নিং দেখায়। আবার কিছু অ্যাপ ব্যাকগ্রাউন্ডে এত বেশি রিসোর্স ব্যবহার করে যে চার্জ  ঢোকার চেয়ে খরচ বেশি হয়ে যায়। এক্ষেত্রে করণীয় হচ্ছে- 

  • ফোন রিস্টার্ট করুন।
  • অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ বন্ধ করুন।
  • সফটওয়্যার আপডেট আছে কিনা চেক করুন। 

৪. পুরোনো বা দুর্বল ব্যাটারি

ব্যাটারির সময়ের সাথে সাথে পারফরম্যান্স কমে যায়। পুরনো ব্যাটারি চার্জ ধরে রাখতে পারে না, ফলে মনে হয় ফোন চার্জ নিচ্ছে না। আবার হঠাৎ করে চার্জ কমে যাওয়া, দ্রুত ড্রেইন হওয়া এগুলো ব্যাটারি দুর্বল হওয়ার লক্ষণ। সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো ব্যাটারি ফুলে যাওয়া। এতে শুধু চার্জিং না, পুরো ফোনই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। এক্ষেত্রে করণীয় হচ্ছে-

  • ব্যাটারি দ্রুত কমে গেলে চেক করান। 
  • ফুলে গেলে একদম ব্যবহার বন্ধ করে দিন। নতুন ব্যাটারি ব্যবহার করুন।  

৫. মোবাইল হিটিং ইস্যু 

ফোন খুব গরম হলে অনেক ডিভাইস সেফটির জন্য চার্জিং বন্ধ করে দেয়। এটা আসলে সমস্যা না, বরং প্রোটেকশন মেকানিজম। গেম খেলতে খেলতে চার্জ দেওয়া, বা গরম জায়গায় ফোন রাখা, এগুলো করলে এই সমস্যা বেশি হয়। এক্ষেত্রে করণীয় হচ্ছে-

  • চার্জের সময় ভারী কাজ এড়িয়ে চলুন। 
  • কভার খুলে রাখুন। 
  • ঠান্ডা পরিবেশে চার্জ দিন। 

৬. টেম্পারেচার ও অন্যান্য হার্ডওয়্যার সমস্যা 

অতিরিক্ত ঠান্ডা বা গরম টেম্পারেচারও চার্জিং অস্বাভাবিক হতে পারে। এছাড়া মাদারবোর্ড বা চিপসেটের সমস্যাও চার্জিং বন্ধ করে দিতে পারে যেটা সাধারণ ইউজার নিজে ঠিক করতে পারবে না। এক্ষেত্রে করণীয় হচ্ছে-

  • টেম্পারেচার স্বাভাবিক রাখুন।
  • সব কিছু ঠিক থাকলেও চার্জ না হলে সার্ভিস সেন্টারে যান।  

৭. ব্যাকগ্রাউন্ড অ্যাপ

অনেক সময় আপনি দেখবেন ফোন চার্জে দেওয়া আছে, কিন্তু ব্যাটারি বাড়ার বদলে ধীরে ধীরে কমছে বা খুব স্লো বাড়ছে। এখানে সমস্যা চার্জারে না, সমস্যা হচ্ছে ফোনের ভেতরের ব্যবহার।

কিছু অ্যাপ ব্যাকগ্রাউন্ডে চলতে থাকে এবং প্রসেসর, ডাটা, লোকেশন সবকিছু ব্যবহার করে। ফলে যে পরিমাণ চার্জ ঢুকছে, তার একটা বড় অংশ সেখানেই খরচ হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে মনে হয় ফোন ঠিকমতো চার্জ নিচ্ছে না। এটা বুঝতে হলে চার্জিংকে শুধু “পাওয়ার ইন” হিসেবে না দেখে “নেট পাওয়ার” হিসেবে ভাবতে হবে। যদি খরচ বেশি হয়, তাহলে ইনপুট থাকলেও ব্যাটারি বাড়বে না। এক্ষেত্রে করণীয় হচ্ছে-

  • চার্জ দেওয়ার আগে অপ্রয়োজনীয় অ্যাপগুলো ক্লোজ করুন। 
  • ব্যাটারি সেটিংসে গিয়ে দেখুন কোন অ্যাপ বেশি চার্জ খাচ্ছে। 
  • চার্জের সময় গেমিং, ভিডিও এডিটিং এড়িয়ে চলুন। 

৮. পাওয়ার সোর্সে সমস্যা 

অনেকে ধরে নেয় চার্জ হচ্ছে না মানেই ফোন বা চার্জারের সমস্যা। কিন্তু অনেক সময় আসল সমস্যা থাকে পাওয়ার সোর্সে। লো-ভোল্টেজ, ঢিলা সকেট, বা খারাপ মাল্টিপ্লাগ ঠিকমতো পাওয়ার দিতে পারে না। ফলে চার্জার ঠিক থাকলেও আউটপুট কমে যায়, আর চার্জিং স্লো হয়। এটা বিশেষ করে যখন ল্যাপটপের USB পোর্ট বা সস্তা এক্সটেনশন বোর্ড দিয়ে চার্জ দেওয়া হয় তখন দেখা যায়। এক্ষেত্রে করণীয় হচ্ছে-

  • সরাসরি ওয়াল সকেটে চার্জ দিয়ে দেখুন।
  • অন্য সকেট বা প্লাগ ব্যবহার করে টেস্ট করুন।
  • ল্যাপটপ USB এর বদলে অ্যাডাপ্টার ব্যবহার করুন।  

৯. “লুজ” ক্যাবল সংযোগ

অনেক সময় চার্জিং পোর্ট এবং ক্যাবল কানেকশন ঠিক থাকলেও ফোনের চার্জ স্লো হয়। কারণ সংযোগ পুরোপুরি স্টেবল থাকেনা। ক্যাবল একটু নড়লেই চার্জ অন-অফ হয়, এর মানে হচ্ছে সংযোগ ঠিকমতো বসছে না। পোর্ট লুজ, ক্যাবলের হেড লুজ, বা ভেতরে ক্ষয় হওয়ার কারনে এমন হতে পারে। এই সমস্যা ধরা কঠিন, কারন মাঝে মাঝে ঠিকই কাজ করে। এক্ষেত্রে করণীয় হচ্ছে-

  • চার্জ দেওয়ার সময় ক্যাবল নড়ালে চার্জিং বদলায় কিনা দেখুন। 
  • ঢিলা লাগলে অন্য ক্যাবল দিয়ে টেস্ট করুন। 
  • সমস্যা থাকলে পোর্ট চেক করান। 

১০. “Optimized Charging” বা চার্জিং লিমিট ফিচার 

অনেক স্মার্টফোনে এখন ব্যাটারি হেলথ বাঁচানোর জন্য চার্জিং লিমিট বা অপ্টিমাইজড চার্জিং ফিচার থাকে। এতে ফোন ইচ্ছাকৃতভাবে চার্জ ধীরে করে বা ৮০–৯০% এ থেমে থাকে। অনেকেই এটাকে সমস্যা মনে করে, কিন্তু এটা আসলে সম্যসা নয়। এক্ষেত্রে করণীয় হচ্ছে-

  • সেটিংসে গিয়ে Battery বা Charging অপশন চেক করুন। 
  • যদি Optimized Charging অন থাকে, সেটার আচরণ বুঝে ব্যবহার করুন। 
  • প্রয়োজন হলে সাময়িকভাবে বন্ধ করে টেস্ট করুন। 

সেফ মোডে পরীক্ষা করুন

কিছু অ্যাপ ব্যাকগ্রাউন্ডে অতিরিক্ত রিসোর্স ব্যবহার করে বা সিস্টেমের চার্জিং আচরণে হস্তক্ষেপ করে। ফলে ফোন চার্জ নিচ্ছে, কিন্তু সেটি স্বাভাবিক গতিতে হচ্ছে না। এই জায়গায় “সেফ মোড” একটি কার্যকর টেস্টিং টুল। সেফ মোডে চালু করলে ফোন শুধু ডিফল্ট সিস্টেম অ্যাপ চালায়, তৃতীয় পক্ষের অ্যাপগুলো বন্ধ থাকে। এতে সহজেই বোঝা যায় সমস্যা অ্যাপ-জনিত কিনা।

এখানে মূল বিষয় হলো অনুমান নয়, ডেটা দিয়ে কারন বের করা। একই উপসর্গ (চার্জ স্লো বা না হওয়া) একাধিক কারনে হতে পারে, তাই এই ধরনের আলাদা করে পরীক্ষা করা সবচেয়ে স্মার্ট পদ্ধতি।

আপনার করণীয় হচ্ছে- 

  • ফোন সেফ মোডে চালু করে চার্জিং টেস্ট করুন।
  • সেফ মোডে ঠিকমতো চার্জ হলে বুঝবেন কোনো অ্যাপ সমস্যার কারন। 
  • সাম্প্রতিক ইনস্টল করা বা সন্দেহজনক অ্যাপ আনইনস্টল করুন।  

 

কখন সার্ভিস সেন্টারে যাবেন?

সব চেষ্টা করার পরও যদি ফোন চার্জ না নেয়, তাহলে অনুমোদিত সার্ভিস সেন্টারে নেওয়াই সঠিক সিদ্ধান্ত। অনেক সময় ব্যাটারি বা চার্জিং পোর্টে অভ্যন্তরীণ ত্রুটি থাকে। এছাড়াও মাদারবোর্ড বা চিপসেটের মতো হার্ডওয়্যার সমস্যাও কারন হতে পারে। তাই নিজে থেকে মোবাইল খুলে মেরামত করতে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। ভুল মেরামতে ক্ষতি আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে ব্যাটারি ফুলে গেলে, পোর্ট ক্ষতিগ্রস্ত হলে, বা ফোন গরম হয়ে গেলে দ্রুত পেশাদার সহায়তা নেওয়া উচিত। আর পেশাদার মোবাইল সার্ভিসিং পেতে চলে আসতে পারেন Apple  Gadgets  Care -এ।  

শেষ কথা

ফোনে চার্জের সমস্যা হলেই নতুন ফোন কেনার দরকার নেই। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সমাধান খুবই সহজ: চার্জার ও কেব্‌ল বদলানো, পোর্ট পরিষ্কার করা, ফোন রিস্টার্ট করা, ব্যাকগ্রাউন্ড অ্যাপ বন্ধ করা, সফটওয়্যার আপডেট করা, এবং ব্যাটারির অবস্থা যাচাই করা। 

আর যদি এগুলোতে কাজ না হয়, তাহলে সেটাকে “ছোট সমস্যা” ভেবে ফেলে রাখা উচিত নয়। কারন চার্জিং সমস্যা কখনও কখনও ব্যাটারি, পোর্ট, বা ভেতরের হার্ডওয়্যার ত্রুটির ইঙ্গিতও হতে পারে।